আপনার কোনো আত্মীয় বা পরিচিত জন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকদের মুখে আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, বা ভেন্টিলেশনের (লাইফ সাপোর্ট) কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এই ইউনিটগুলোর কাজ কী বা শারীরিক অবস্থার কোন পর্যায়ে একজন রোগীকে কোথায় নেওয়া হয়—এসব নিয়ে অনেকের মধ্যেই অস্পষ্টতা এবং ভুল ধারণা রয়েছে।
চলুন জেনে নিই এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলো আসলে কী এবং কখন কোনটির প্রয়োজন হয়।
এইচডিইউ (HDU) বলতে কী বোঝায়?
এইচডিইউ-এর পূর্ণরূপ হলো ‘হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট’ (High Dependency Unit)।
সহজ কথায়, সাধারণ ওয়ার্ড বা কেবিন এবং আইসিইউ-এর মাঝামাঝি যে অবস্থা সেটি হলো এইচডিইউ। রোগীর অবস্থা যখন খুব বেশি খারাপ থাকে না, আবার পুরোপুরি স্বাভাবিকও থাকে না, বরং তার জন্য অতিরিক্ত মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়—তখন তাকে এইচডিইউ-তে পাঠানো হয়।
রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিমাপ করা হয় তার ‘ভাইটালস’ (Vitals) দেখে। যেমন:
- হার্ট রেট বা হৃদস্পন্দন
- রক্তচাপ
- রক্তে অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা
- শরীরে এসিড ও লবণের পরিমাণ
- ইউরিন আউটপুট ইত্যাদি
এই ভাইটালসগুলো যখন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তখনি স্পেশাল মনিটরিংয়ের জন্য রোগীকে এইচডিইউ বা লেভেল-১/লেভেল-২ কেয়ারে রাখা হয়।
রোগীকে কখন সিসিইউ (CCU)-তে নিতে হয়?
সিসিইউ-এর পূর্ণরূপ হলো ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ (Coronary Care Unit)।
এটি মূলত হৃদরোগীদের জন্য বিশেষায়িত একটি ইউনিট। হৃদরোগজনিত জরুরি অবস্থা যেমন—হার্ট অ্যাটাক বা অ্যাকিউট করোনারি সিন্ড্রোম ইত্যাদি ক্ষেত্রে রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডে না রেখে সিসিইউ-তে রাখা হয়।
যেসব হার্টের রোগীর অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে আরও খারাপ হতে পারে বা পুনরায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে, তাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্যই সিসিইউ। তবে হৃদরোগের পাশাপাশি ফুসফুস, কিডনি বা মস্তিষ্কের মতো কোনো অঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিলে তখন মাল্টিপল অর্গান সাপোর্টের জন্য সিসিইউ থেকে আইসিইউতেও স্থানান্তর করার প্রয়োজন হতে পারে।
আইসিইউ (ICU) কী?
আইসিইউ-এর পূর্ণরূপ হলো ‘ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট’ (Intensive Care Unit)। অনেক হাসপাতালে একে ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট’ও বলা হয়ে থাকে।
যখন কোনো রোগীর একাধিক অঙ্গের জন্য বাহ্যিক সাপোর্ট প্রয়োজন হয়, তখন তাকে আইসিইউ-তে নেওয়া হয়। যেমন: রোগীর অবস্থার অবনতি হলে যদি ডায়ালাইসিস করতে হয়, অথবা ফুসফুস নিজে থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন নিতে না পারে—এমন অবস্থায় প্রয়োজনীয় স্নায়ু বা অঙ্গ সক্রিয় রাখতে আইসিইউ-র সহায়তা নেওয়া হয়।
আইসিইউ-তে নেওয়ার জন্য রোগীকে আগে এইচডিইউ-তে থাকতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। ইমার্জেন্সিতে আসা অনেক রোগীকেও মুমূর্ষু অবস্থায় সরাসরি আইসিইউ-তে পাঠাতে হতে পারে।
বর্তমানে আইসিইউ-এর কিছু বিশেষায়িত ইউনিটও দেখা যায়। যেমন:
- সার্জিকাল আইসিইউ
- মেডিকেল আইসিইউ
- নিউরো আইসিইউ (মস্তিষ্কের জটিলতার জন্য)
- পেডিয়াট্রিক ও নিওনাটাল আইসিইউ (শিশুদের জন্য)
- রেসপিরেটরি আইসিইউ এবং লিভার আইসিইউ
ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট কী?
খুব সংকটময় অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখার কৃত্রিম প্রক্রিয়াই হলো ভেন্টিলেশন, সাধারণ মানুষ যাকে ‘লাইফ সাপোর্ট’ বলে থাকেন।
যে রোগীর ফুসফুস এতটাই খারাপ যে নিজে থেকে অক্সিজেন নিতে পারছে না বা কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে পারছে না, তখন এই কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট দেওয়া হয়।
কিডনি বা অন্য অঙ্গের সমস্যা গুরুতর হলেও চিকিৎসার জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু শ্বাসযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ না করলে ৪ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যেই রোগীর ব্রেন স্থায়ীভাবে ড্যামেজ বা নষ্ট হওয়া শুরু করে। তাই এমন ইমার্জেন্সি মুহূর্তে শ্বাসযন্ত্রকে সচল রাখা জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক, যে কারণে অনেকে এটিকে ‘লাইফ সাপোর্ট’ বলেন।
লাইফ সাপোর্ট মানেই কি নিশ্চিত মৃত্যু?
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে যে, ‘লাইফ সাপোর্ট মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, এখান থেকে কেউ ফেরে না’। এটি একেবারেই সঠিক নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট একটি আধুনিক চিকিৎসা প্রক্রিয়া, যা রোগীকে বাঁচিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই করা হয়। এটি একটি ট্রিটমেন্ট অপশন। অনেক সময় লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান।
তবে এই ভুল ধারণা তৈরির পেছনে দুটি বড় কারণ দায়ী: ১. আর্থিক সক্ষমতার অভাব: দীর্ঘমেয়াদে আইসিইউ বা লাইফ সাপোর্টের খরচ বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ২. আইসিইউ বেডের স্বল্পতা: অনেকে একদম শেষ পর্যায়ে বা ‘টার্মিনাল স্টেজ’-এ এসে লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা করেন। অথচ হয়তো ২-৩ দিন আগে এই সাপোর্ট পেলে রোগীর জন্য কার্যকরী হতো। যখন অনেক দেরি হয়ে যায়, তখন কনসেন্ট দিলেও রোগীকে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ কথা:
বয়স, জেনেটিক্স এবং রোগের বিস্তারিত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে ஒவ்வொரு রোগীর চিকিৎসার আউটকাম আলাদা হতে পারে। আইসিইউ, সিসিইউ বা ভেন্টিলেশন কোনো ভীতিকর জায়গা নয়; বরং এগুলো উন্নত বিজ্ঞান ও চিকিৎসাব্যবস্থার অংশ, যা মুমূর্ষু রোগীকে দ্বিতীয় জীবন দিতে সাহায্য করে।