১৪ বছর বয়সেই যদি মাথার চুল পাকতে শুরু করে, তবে যে কারো জন্যই তা দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। এমনটাই ঘটেছিল কানাডার মেয়ে অ্যাশলে শুঁকুরুর সাথে। বন্ধুরা যখন তার মাথায় প্রথম ধূসর চুল দেখতে পায়, তখন তা ঢাকতে চুল রং করার কথা ভেবেছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে এমন অল্প বয়সে চুল পেকে যাওয়া বা অকালপক্ব চুল নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়ছে, যাদের বেশিরভাগেরই বয়স ২০ থেকে ৩০-এর কোঠায়।
মানুষের চুল কি আগের চেয়ে কম বয়সে পাকছে?
কখন চুল ধূসর হতে শুরু করবে, তা নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে জেনেটিক্স বা জিনগত প্রভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা মানুষদের মধ্যে ককেশীয়দের (সাদাদের) চুল সাধারণত ৩৫ বছর বয়সে পাকা শুরু হয়। অন্যদিকে, এশিয়ান এবং আফ্রিকানদের ক্ষেত্রে তা আরও ১০ বছর পরে দেখা যায়।
এর বেশ আগেই যদি চুল পাকতে শুরু করে, তবে তাকে ‘অকালপক্ব’ বা ‘অকালে চুল পাকা’ বলা হয়। যেমন এশিয়ানদের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের আগে এবং আফ্রিকানদের ক্ষেত্রে ৩০ বছরের আগে চুল পাকলে তাকে স্বাভাবিক ধরা হয় না। চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সের সীমারেখাগুলো জানা প্রয়োজন যাতে বোঝা যায় কখন এটি স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ এবং কখন এর পেছনে অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত কারণ লুকিয়ে আছে।
চুল কেন সাদা বা ধূসর হয়? বিজ্ঞান কী বলে?
আমাদের ত্বকের লোমকূপ থেকে নতুন চুল গজায়। এই লোমকূপে ‘মেলানোসাইট’ নামের কোষ থাকে, যা দুই ধরনের মেলানিন পিগমেন্ট (রঞ্জক) তৈরি করে: ১. ইউমেলানিন: যা চুলের গাঢ় রঙ নির্ধারণ করে। ২. ফিওমেলানিন: যা চুলের লাল বা হলুদ রঙ ঠিক করে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে চুল বারবার ঝরে এবং পুনরায় জন্মায়। এই প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে মেলানোসাইট স্টেম কোষগুলোর একটি বড় অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। স্টেম কোষগুলো লোমকূপের ভেতর ঘুরে বেড়ানো বন্ধ করে স্থির হয়ে যায় এবং তারা আর পূর্ণাঙ্গ মেলানোসাইটে পরিণত হতে পারে না। ফলে রঙ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চুল ধূসর, সাদা বা রূপালি হয়ে যায়।
অকালে চুল পাকার পেছনের মূল কারণগুলো
১. মানসিক এবং শারীরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের গবেষকদের মতে, তীব্র মানসিক বা শারীরিক চাপে চুল ও ত্বকের রঙ নিয়ন্ত্রণকারী কোষগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২. পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিনের ঘাটতি
আগেভাগে চুল পাকা অনেক সময় গুরুতর পুষ্টিহীনতার লক্ষণ হতে পারে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ চিকিৎসক ডা. সেরমেদ মেজহারের মতে, এটি সমাধানের জন্য রুটিন চেকআপ জরুরি। মূলত নিচের উপাদানগুলোর ঘাটতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে:
- ভিটামিন বি-১২: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে, যা লোমকূপসহ সারা শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। অক্সিজেন সরবরাহ কমে গেলে চুলের রঙ তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
- কপার (তামা): কপার ‘টায়রোসিনেজ’ নামের একটি এনজাইমকে সক্রিয় করে, যা মেলানিন তৈরি করতে সাহায্য করে। ঝিনুকজাতীয় খাবার, তিলের বীজ, এবং গাঢ় সবুজ শাকসবজি ও গরুর কলিজায় প্রচুর কপার পাওয়া যায়।
- অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ: ভিটামিন ডি, আয়রন, জিংক এবং ফোলেটের ঘাটতিও অকালে চুল পাকার কারণ হতে পারে।
সতর্কতা: অতিরিক্ত জিংক বা ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তা শরীরে কপার শোষণে বাধা দিতে পারে। কোভিড মহামারির সময় অনেকেই অতিরিক্ত জিংক খেয়েছেন, যা প্রকারান্তরে কপারের ঘাটতি তৈরি করে চুল পাকার কারণ হতে পারে।
৩. ভারী ধাতু ও দূষণের প্রভাব
শিল্পায়নের যুগে আমরা প্রতিনিয়ত ভারী ধাতু যেমন—সীসা, ক্যাডমিয়াম বা পারদের সংস্পর্শে আসছি। পুষ্টিবিদ মারিয়া মার্লো নিজের শারীরিক পরীক্ষার পর জানতে পারেন যে, তার শরীরে লিড (সীসা) এবং ক্যাডমিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেছে যা খনিজ শোষণে বাধা দিচ্ছিল। এই ভারী ধাতুগুলো শ্বাস নেওয়া বাতাস বা মাছের মতো খাবারের মাধ্যমে শরীরে জমতে পারে। যখন শরীর তার সহ্যক্ষমতার চেয়ে বেশি ভারী ধাতু গ্রহণ করে, তখনই অকালে চুল পাকার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৪. অক্সিডেটিভ স্ট্রেস
সিগারেটের ধোঁয়া, অতিরিক্ত মদপান এবং দূষিত আবহাওয়া ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ তৈরি করে। ফলে শরীরে ‘ফ্রি র্যাডিক্যাল’ বা ক্ষতিকর অণু বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি ডিএনএ-এর ক্ষতি করে এবং চুল পড়া বা অকালে চুল পেকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
খাদ্যাভ্যাস কি অকালে চুল পেকে যাওয়া রোধ করতে পারে?
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, মানসিক চাপ কমালে নতুন চুল আবার তার স্বাভাবিক রঙে ফিরে আসতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য পুষ্টিহীনতার কারণে চুল পাকার ক্ষেত্রেও।
যদি জিনগত কারণে চুল না পেকে পুষ্টির ঘাটতির কারণে পাকে, তবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে তা রোধ করা সম্ভব:
- শরীরে ভিটামিন বি-১২, কপার, ভিটামিন ডি বা থাইরয়েডের অভাব থাকলে তা পূরণ করলে চুলের পিগমেন্ট আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।
- ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও সবজি রাখতে হবে, কারণ এতে থাকা ‘অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট’ অক্সিডেটিভ স্ট্রেস রোধ করে ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে।
তবে মনে রাখা জরুরি, এর কোনো জাদুকরী বা তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। মিস মার্লো জানান, তার নিজের ডায়েট পরিবর্তন এবং ভারী ধাতু কমানোর পর চুলের দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লেগেছিল।
পরিশেষে: পাকা চুল মানেই বয়স বেড়ে যাওয়া বা কুৎসিত হওয়ার লক্ষণ নয়। এটি হতে পারে আপনার স্বাতন্ত্র্য বা শারীরিক কোনো ঘাটতির ইঙ্গিত। অনলাইনে এখন অনেক তরুণ-তরুণীই তাদের পাকা চুলকে লুকানোর বদলে আত্মবিশ্বাসের সাথে মেনে নিচ্ছেন। তাই অকালে চুল পাকলে তা লুকিয়ে না রেখে এর পেছনের আসল কারণটি খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।