মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা (Supreme Leader) আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক যৌথ হামলায় তার মৃত্যু বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আলী খামেনির অসংখ্য অনুসারী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন, যারা তাকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিভাবক হিসেবে সম্মান করতেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা এই কিংবদন্তি এবং একইসাথে চরম বিতর্কিত নেতার জন্ম, দারিদ্র্যপীড়িত শৈশব, শাহ বিরোধী আন্দোলন এবং কীভাবে তিনি ইরানের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলেন, তার পুরো জীবনী জানবো।
১. জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
আলী খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে। তিনি ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার বাবা জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ধার্মিক এবং পণ্ডিত শিয়া আলেম (ক্লেরিক), যিনি ইরাকের নাজাফ শহরে পড়াশোনা করেছিলেন।
খামেনির ছোটবেলা কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে মাঝে মাঝেই রাতের খাবারে শুধু রুটি আর কিসমিস জুটতো। তবে এই দারিদ্র্য তাদের জ্ঞানচর্চায় কোনো বাধা হতে পারেনি। শিশু বয়স থেকেই তিনি মাশহাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্কুলে (মক্তব) পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে লজিক, দর্শন ও ইসলামি আইনশাস্ত্র নিয়ে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি শিয়া শিক্ষার মূল কেন্দ্র ‘কোম’ (Qom) শহরে পাড়ি জমান, যেখানে তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সরাসরি সাহচর্যে আসেন।
২. রাজনৈতিক জীবন ও শাহ বিরোধী আন্দোলন
১৯৬২ সাল থেকে আলী খামেনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে তৎকালীন ইরানের পশ্চিমা-পন্থি শাসক ‘শাহ’-এর (Mohammad Reza Pahlavi) বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। শাহের ইসলাম-বিরোধী এবং আমেরিকাপন্থি নীতির সমালোচনার কারণে তাকে বারবার গ্রেফতার করা হয় এবং চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
১৯৭০-এর দশকে তাকে তিন বছরের জন্য নির্বাসনেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি বিপ্লবের আদর্শ থেকে সরে আসেননি। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ইসলামি বিপ্লব’-এর মাধ্যমে শাহের পতন হলে খামেনি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
৩. সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে উত্থান ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া
বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালে তিনি রেভল্যুশনারি কাউন্সিলের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সাময়িকভাবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি তেহরানের জুমার নামাজের প্রধান ইমাম হিসেবেও নিযুক্ত হন।
১৯৮১ সালের জুন মাসে এক মারাত্মক বোমা হামলায় তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান, তবে তার ডান হাত চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। এই ঘটনার কয়েক মাস পর, ১৯৮১ সালের অক্টোবরে তিনি বিপুল ভোটে ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে এই দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলেই ধ্বংসাত্মক ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) সংঘটিত হয়েছিল, যে সময়ে তিনি আইআরজিসি (IRGC)-কে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন।
৪. সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ
১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর, ৪ জুন ১৯৮৯ তারিখে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ আলী খামেনিকে ইরানের দ্বিতীয় ‘সর্বোচ্চ নেতা’ (Supreme Leader) হিসেবে নির্বাচিত করে।
এটি ছিল একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, কারণ তখন তিনি শীর্ষস্থানীয় কোনো ধর্মীয় আলেম (গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ) ছিলেন না। তাকে এই পদে বসানোর জন্য ইরানের সংবিধানেও পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। যদিও শুরুতে তিনি এই বিশাল দায়িত্ব নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজের ক্ষমতাকে এমনভাবে সুসংহত করেন যে, বিচারবিভাগ, সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম—সবকিছুর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসে। দীর্ঘ ৩৭ বছর এই পদে থেকে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রপ্রধানের রেকর্ড গড়েন।
৫. মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রভাব
আলী খামেনি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অঘোষিত কৌশলগত পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পেছনে ইরানের যে বিশাল সামরিক ও লজিস্টিক সমর্থন, তার মূল রূপকার ছিলেন তিনিই। এ কারণেই পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েল তাকে তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতো, অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী এবং পশ্চিমা-বিরোধী লাখো মানুষ (যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও রয়েছেন) তাকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিভাবক হিসেবে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন।
৬. মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারের চরম বিরোধী ছিল। এর চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, সিআইএ (CIA) এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)-এর যৌথ পরিচালিত একটি নিখুঁত সামরিক অভিযানে তেহরানে খামেনির নিজস্ব কম্পাউন্ডে শক্তিশালী মিসাইল হামলা চালানো হয়।
এই মারাত্মক হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনি, তার এক কন্যা, জামাতা এবং নাতি-নাতনিসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় ২ মার্চ তার স্ত্রীও মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনার পর ইরান সরকার ৪০ দিনের জাতীয় শোক ও ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করে এবং লাখ লাখ মানুষ কালো পোশাক পরে রাস্তায় নেমে শোক প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, সরকারের কট্টর বিরোধীদের একটি অংশকে উল্লাস করতেও দেখা যায়, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম মেরুকৃত অবস্থাকেই প্রমাণ করে।
উপসংহার: আলী খামেনির জীবন ছিল দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে একটি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার গল্প। ইসলামি বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখা এবং বিশ্ব দরবারে ইরানকে একটি শক্তিশালী, আপোষহীন রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করানোর পেছনে তার অবদান ইরানের ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে। তার মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব আগামী বহু দশক ধরে অনুভূত হবে।