AskBangla
Iranian Missile Inventory and Power
আন্তর্জাতিক

ইরানের মিসাইল ভাণ্ডার: কীভাবে নিষেধাজ্ঞার মাঝেও তারা আজ অপরাজেয় শক্তি?

Ifty Islam

MD. Ifthe Kharul Islam (Ifty)

Exploring new things.

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং তর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নাম হলো ইরানের মিসাইল শক্তি। দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইরান কীভাবে আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মিসাইল ভাণ্ডারের অন্যতম মালিক হয়ে উঠল, তা এক বিস্ময়।

নিজেদের আকাশকে সুরক্ষিত রাখতে এবং শত্রুর বিমান বাহিনীর মোকাবিলা করতে ইরান যে ‘স্বাবলম্বিতা’ (Indigenization) অর্জন করেছে, তাকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সফল রণকৌশল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো পরাশক্তির তুলনায় ইরানের মিসাইল প্রযুক্তি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং আধুনিক।

এই আর্টিকেলে আমরা গভীর বিশ্লেষণ করব ইরানের হাতে থাকা সেইসব মরণাস্ত্র সম্পর্কে, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাপিয়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


⚡ এক নজরে ইরানের মিসাইল রণকৌশল (Key Highlights)


১. হাইপারসোনিক মিসাইল: গতির দুনিয়ায় ইরানের বিপ্লব

২০২৩ এবং ২০২৪ সালে ইরান যখন তাদের হাইপারসোনিক মিসাইল প্রকাশ্যে আনে, তখন পুরো বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকরা নড়েচড়ে বসেন। হাইপারসোনিক মানেই হলো যা শব্দের চেয়ে ৫ গুণ বেশি গতিতে চলে।

ফাতাহ-১ হাইপারসোনিক মিসাইলের উন্মোচন অনুষ্ঠান ফাতাহ-১ (Fattah-1) হাইপারসোনিক মিসাইলের উন্মোচন অনুষ্ঠান

ফাতাহ-২ হাইপারসোনিক গ্লাইড ভেহিকেল ফাতাহ-২ হাইপারসোনিক গ্লাইড ভেহিকেল

💡 আপনি কি জানতেন? ইরানের ফাতাহ মিসাইলটির নাম দিয়েছিলেন খোদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ‘ফাতাহ’ শব্দের অর্থ হলো বিজয়ী বা খোলার চাবিকাঠি।


২. ব্যালিস্টিক মিসাইল: যখন পাল্লা সীমানা ছাড়িয়ে যায়

ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো মূলত ইসরায়েল এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যে কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।

খোররামশহর-৪ (Khorramshahr-4) বা খাইবার (Khaibar)

এটি ইরানের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভারী এবং শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল। এটি ২,০০০ কিমি পাল্লার মধ্যে প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ কেজি ওজনের বিশাল বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এর শক্তিশালি ‘খাইবার’ সংস্করণটি লিকুইড-ফুয়েল চালিত হলেও এতে এমন উন্নত হাইপারগোলিক ফুয়েল ব্যবহার করা হয়েছে যা লঞ্চ করার প্রস্তুতি সময়কে মাত্র ১২ মিনিটে নামিয়ে এনেছে। এটি বায়ুমণ্ডলের বাইরে Mach 16 গতিতে চলে এবং এর উন্নত গাইডেন্স সিস্টেম এটিকে কক্ষপথের বাইরেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

খোররামশহর-৪ (Khorramshahr-4) বা খাইবার (Khaibar) খোররামশহর-৪ (Khorramshahr-4) বা খাইবার (Khaibar)

সেজ্জিল (Sejjil-2)

সেজ্জিল হলো একটি দুই স্তরের কঠিন জ্বালানি (Solid-fuel) চালিত মিসাইল, যা ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষা করা হয়। এর পাল্লা ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহন করে। কঠিন জ্বালানি হওয়ার কারণে এটিকে লঞ্চার ট্রাক বা সাইলো থেকে অত্যন্ত দ্রুত ফায়ার করা যায়। এর গতি এবং নির্ভুলতা (CEP ৫-৫০ মিটার) একে ইরানের অন্যতম প্রধান স্ট্র্যাটেজিক মরণাস্ত্র করে তুলেছে।

সেজ্জিল (Sejjil-2) সেজ্জিল (Sejjil-2)

এমাদ (Emad) ও গদর (Ghadr)

‘এমাদ’ হলো ইরানের প্রথম নির্ভুল লক্ষ্যভেদী (Precision-guided) দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল, যা ২০১৫ সালে উন্মোচিত হয়। এর রেঞ্জ প্রায় ১,৭০০-১,৮০০ কিমি। এটি শাহাব-৩ এর একটি উন্নত সংস্করণ। অন্যদিকে ‘গদর-১১০’ (Ghadr-110) হলো শাহাব-৩ এর একটি দ্রুততর সংস্করণ যা ১,৬০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লায় আঘাত করতে পারে।

এমাদ (Emad) এমাদ (Emad)

গদর (Ghadr) গদর (Ghadr)


৩. স্বল্প পাল্লার ও নির্ভুল মিসাইল (SRBM)

ইরানের আদি মিসাইল প্রযুক্তি শাহাব সিরিজ থেকে শুরু হলেও বর্তমানে তারা অনেক বেশি নির্ভুল স্বল্প পাল্লার মিসাইল তৈরি করেছে।

জোলফাগার (Zolfaghar) জোলফাগার (Zolfaghar)

কিয়াম-১ (Qiam-1) কিয়াম-১ (Qiam-1)

শাহাব-৩ (Shahab-3) শাহাব-৩ (Shahab-3)


৪. ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল: রাডারের চোখের আড়ালে

ব্যালিস্টিক মিসাইল যেমন আকাশের অনেক উপর দিয়ে ওঠে, ক্রুজ মিসাইল ঠিক তার উল্টো। এটি মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়।


🛡️ ‘মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ মিসাইল শহর: ইরানের গোপন শক্তি

ইরান একমাত্র দেশ যারা মাটির শত শত মিটার গভীরে বিশাল শহর আকৃতির মিসাইল বেস তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে বড় বড় মিসাইল বহনকারী ট্রাক নির্দ্বিধায় চলাচল করতে পারে। এমনকি পারমাণবিক হামলা হলেও এই সব বেস অক্ষত থাকবে বলে দাবি করা হয়। মিসাইল সিটি মিসাইল সিটি

📌 বিশেষ নোট: এই প্রযুক্তি ইরান ও হিজবুল্লাহর মতো গ্রুপগুলোকে যুদ্ধে এক বাড়তি সুবিধা দেয়, কারণ ওপর থেকে স্যাটেলাইট বা ড্রোন দিয়ে এগুলো ধরা প্রায় অসম্ভব।


❓ সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. ইরানের মিসাইল কি আসলেই ইসরায়েলে আঘাত করতে সক্ষম?
হ্যাঁ। ইরান থেকে ইসরায়েলের সরাসরি দূরত্ব প্রায় ১,০০০ থেকে ১,২০০ কিমি। ইরানের শাহাব-৩, সেজ্জিল এবং ফাতাহ মিসাইলগুলোর রেঞ্জ এই দূরত্বের চেয়ে অনেক বেশি।

২. কেন পশ্চিমারা ইরানের মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে এত চিন্তিত?
কারণ ইরান তাদের মিসাইলগুলো শুধু নিজেদের জন্য তৈরি করছে না, বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মিত্রদেরও (যেমন হিজবুল্লাহ বা হুথি) এই প্রযুক্তি শেখাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।

৩. ইরানের মিসাইল প্রযুক্তির মূল উৎস কী?
এক সময় ইরান সোভিয়েত বা উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানের ফাতাহ বা খোররামশহর মিসাইলগুলো পুরোপুরি ইরানের নিজস্ব গবেষণার ফসল।