আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসে আকাশপথে হামলার ধরন বদলে দিয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি। আর বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত এবং ভয়ংকর ড্রোনের নাম হলো ‘শাহেদ’ (Shahed)। ইরানের তৈরি এই ড্রোনগুলোকে বলা হয় ‘কামিকাজে’ (Kamikaze) বা আত্মঘাতী ড্রোন।
বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হাতে এই ড্রোনগুলো পৌঁছানোর পর যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রই পাল্টে গেছে। তুলনামূলকভাবে কম দামি এবং রাডারে সহজে ধরা না পড়ার কারণে এই অস্ত্রটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানবো শাহেদ ড্রোন ঠিক কতটা ভয়ংকর এবং কেন এটি আধুনিক যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
১. শাহেদ বা কামিকাজে ড্রোন কী?
পার্সিয়ান ও আরবি ভাষায় ‘শাহেদ’ শব্দের অর্থ হলো ‘সাক্ষী’। ইরানের ‘Shahed Aviation Industries’ এবং ‘HESA’ যৌথভাবে এই ড্রোনগুলো তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং কুখ্যাত মডেলটি হলো শাহেদ-১৩৬ (Shahed-136)। রাশিয়া এই মডেলটির নাম পরিবর্তন করে রেখেছে ‘গেরান-২’ (Geran-2)।
কামিকাজে ড্রোন কেন বলা হয়? সাধারণত সামরিক ড্রোনগুলো (যেমন- আমেরিকার এমকিউ-৯ রিপার) আকাশ থেকে মিসাইল হামলা করে আবার নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে আসে। কিন্তু শাহেদ ড্রোনগুলো ভিন্ন। এদের বলা হয় “লোইটারিং মিউনিশন” (Loitering Munition) বা আত্মঘাতী ড্রোন। এরা আকাশে ওড়ে, টার্গেট খুঁজে বের করে এবং সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর মিসাইলের মতো আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এরা আর ফিরে আসে না, অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি কামিকাজে পাইলটদের মতো।
২. শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য (Specifications)
দেখতে অনেকটা ত্রিভুজ বা ডেল্টা-উইং (Delta-wing) আকৃতির এই ড্রোনটির প্রযুক্তি খুব একটা অত্যাধুনিক নয়, তবে এটি অত্যন্ত কার্যকরী:
- আকার ও ওজন: শাহেদ-১৩৬ লম্বায় প্রায় ৩.৫ মিটার এবং এর ডানার বিস্তৃতি (Wingspan) প্রায় ২.৫ মিটার। পুরো ড্রোনটির ওজন প্রায় ২০০ কেজি।
- বিস্ফোরক (Warhead): এর সামনের অংশে ৪০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের হাই-এক্সপ্লোসিভ (High-explosive) ওয়ারহেড বা বোমা থাকে, যা কোনো ভবনে আঘাত করলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।
- ইঞ্জিন ও গতি: এতে একটি সাধারণ পিস্টন ইঞ্জিন (Mado MD550) ব্যবহার করা হয়, যা দেখতে অনেকটা ছোট উড়োজাহাজ বা লন-মাওয়ারের (ঘাস কাটার মেশিন) ইঞ্জিনের মতো। এই সস্তা ইঞ্জিনের কারণে এটি ওড়ার সময় ডার্ট বাইক বা চেইন-স (Chain-saw) মেশিনের মতো প্রচণ্ড শব্দ করে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
- পাল্লা (Range): শাহেদের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটি হলো এর পাল্লা। এটি একনাগাড়ে আড়াই হাজার (২,৫০০) কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে।
- নেভিগেশন: এটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার জন্য ড্রোনের ভেতরে থাকা স্যাটেলাইট নেভিগেশন (GNSS) এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ব্যবহার করে।
৩. কেন শাহেদ ড্রোন এত ভয়ংকর? (The Swarm Strategy)
শাহেদ ড্রোনের মূল শক্তি এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং এর লয়-খরচ এবং ‘সোয়ার্ম’ (Swarm) বা ঝাঁকে ঝাঁকে হামলার কৌশল।
একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ মার্কিন ডলার, যা আধুনিক সামরিক অস্ত্রের তুলনায় একেবারে কিছুই না। অন্যদিকে, এই ড্রোনকে মাঝপথে ধ্বংস করার জন্য ইউক্রেন বা অন্যান্য দেশ যে অত্যাধুনিক সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (যেমন- প্যাট্রিয়ট মিসাইল) ব্যবহার করে, তার একেকটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার!
যুদ্ধে রাশিয়া একসাথে ঝাঁকে ঝাঁকে (১০-২০টি) শাহেদ ড্রোন ছুঁড়ে মারে। এর ফলে রাডার সিস্টেম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল দিয়ে সবগুলো ড্রোন ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। যদি ২০টি ড্রোনের মধ্যে মাত্র ২-৩টিও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, তবে ওই এলাকার পাওয়ার গ্রিড বা সামরিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
৪. যুদ্ধে ব্যবহার এবং প্রভাব
শাহেদ-১৩৬ বা কামিকাজে ড্রোনগুলো বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক যুদ্ধে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে:
- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে এই ইরানি ড্রোন (যাকে তারা ‘গেরান-২’ নামে ডাকে) ব্যবহার করা শুরু করে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল জুড়ে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, এবং সামরিক অবকাঠামোতে হাজার হাজার শাহেদ ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। ২০২৫ সালে শুধুমাত্র এক বছরেই রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ৫৪,০০০-এর বেশি শাহেদ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে জানা যায়।
- মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: শুধু রাশিয়া নয়, ইরান নিজেও এই ড্রোন ব্যবহার করেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলের ওপর হামলায় এবং ২০২৬ সালের মার্চ মাসে উপসাগরীয় দেশগুলোর (যাদের সাথে আমেরিকার মিত্রতা রয়েছে) ওপর স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলায় (যেখানে এক হাজারের বেশি ড্রোন ছোঁড়া হয়) এই শাহেদ-১৩৬ ব্যবহার করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহল নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপকেও এই ড্রোন দেওয়া হয়েছে।
৫. বর্তমানে কোন কোন দেশ এটি ব্যবহার করছে?
মূলত দুটি দেশ এই ড্রোনের প্রধান ব্যবহারকারী:
- ইরান: এই ড্রোনের মূল আবিষ্কারক এবং উৎপাদক।
- রাশিয়া: ইরান থেকে প্রযুক্তি নিয়ে রাশিয়া এখন নিজেদের দেশেই (Alabuga, Tatarstan-এ) এই ড্রোনের বিশাল কারখানা তৈরি করেছে, যেখানে বছরে হাজার হাজার ড্রোন তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ভূপাতিত হওয়া শাহেদ ড্রোনগুলো সংগ্রহ করে এর ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্লেষণ (Reverse-engineering) করেছে এবং নিজেদের জন্য ‘LUCAS’ (Low-cost Uncrewed Combat Attack System) নামে ঠিক একই ধরনের একটি ড্রোন তৈরি করেছে।
৬. রাশিয়ার হাতে শাহেদের আধুনিকায়ন (Russian Enhancements)
প্রাথমিকভাবে শাহেদ-১৩৬ একটি সাধারণ প্রযুক্তির ড্রোন হলেও, রাশিয়া এর ডিজাইন এবং প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে একে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। রাশিয়ার তৈরি এই উন্নত সংস্করণটি গেরান-২ (Geran-2) নামে পরিচিত:
- নেভিগেশন উন্নতকরণ: ইরানের মূল ড্রোনে সাধারণ জিপিএস থাকলেও, রাশিয়া এতে নিজেদের ‘GLONASS’ স্যাটেলাইট নেভিগেশন এবং ‘Kometa’ নেভিগেশন মডিউল লাগিয়েছে, যার ফলে ইউক্রেনের ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সিগন্যাল জ্যাম করে এই ড্রোনকে আর সহজে ভূপাতিত করা যায় না।
- স্টারলিংক এবং ক্যামেরা: ২০২৬ সালের শুরুতে দেখা যায়, রাশিয়া এই ড্রোনগুলোতে এলন মাস্কের ‘Starlink’ স্যাটেলাইট টার্মিনাল, ৪জি/থ্রিজি এন্টেনা এবং থার্মাল ক্যামেরা যুক্ত করেছে। এর ফলে রাতের অন্ধকারে বা ঘন কুয়াশায়ও এরা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু চিনতে পারে।
- ভয়ংকর ওয়ারহেড: ইরানের মূল ড্রোনের বোমার ওজন ছিল ৪০-৫০ কেজি। কিন্তু রাশিয়া একে বাড়িয়ে ৯০ কেজি পর্যন্ত করেছে। তারা এতে থার্মোবারিক (Thermobaric) বিস্ফোরক ব্যবহার করছে, যা সাধারণ বোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি উত্তাপ এবং ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করে।
- স্টেলথ (Stealth) বা ব্ল্যাক পেইন্ট: ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ফাঁকি দেওয়ার জন্য রাশিয়া এখন ড্রোনগুলোর গায়ে কার্বন-যুক্ত বিশেষ এক ধরনের কালো রং (Stealth paint) ব্যবহার করছে। এই রং রাডারের সিগন্যাল শুষে নিতে পারে এবং রাতের আকাশে খালি চোখেও এই কালো ড্রোনগুলো দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
- আকাশপথে যুদ্ধ (Air-to-Air): সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ২০২৫ সালের শেষের দিকে রাশিয়া কিছু গেরান-২ ড্রোনকে এমনভাবে মডিফাই করেছে যে, এগুলো এখন আকাশে বসেই ইউক্রেনের হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমানের দিকে ‘R-60’ মিসাইল ছুঁড়তে পারে।
উপসংহার: শাহেদ-১৩৬ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য সবসময় পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট বা অত্যাধুনিক কোটি ডলারের মিসাইলের প্রয়োজন নেই। সস্তা প্রযুক্তির আত্মঘাতী ড্রোন দিয়েও শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেওয়া সম্ভব। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একটি সাধারণ ড্রোন থেকে যেভাবে এটি একটি হাই-টেক মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে, তা ভবিষ্যতে যেকোনো দেশের সামরিক স্ট্র্যাটেজি বা সমরকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।