আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ (String of Pearls) বা ‘মুক্তার মালা’ কৌশল। শব্দটি শুনলে কোনো সুন্দর গহনার কথা মনে হলেও, ভারতের জন্য এটি এক দুঃস্বপ্নের নাম।
এই কৌশলের মাধ্যমেই চীন ধীরে ধীরে পুরো ভারত মহাসাগর এবং এশিয়া মহাদেশে নিজেদের একচেটিয়া সামরিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় জানবো এই ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ কৌশলটি আসলে কী, এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য কী এবং কেন ভারত একে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখছে।
১. ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ (String of Pearls) আসলে কী?
‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ বা মুক্তার মালা হলো ভারত মহাসাগরে চীনের একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ (Pentagon) এবং ‘বুজ অ্যালেন হ্যামিল্টন’ (Booz Allen Hamilton) নামক একটি কনসাল্টিং ফার্ম তাদের একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তি ও ভূ-কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ব্যাখ্যা করেছিল।
সোজা কথায়, চীন তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে শুরু করে হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার পূর্ব উপকূল) পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সমুদ্রবন্দর, দ্বীপ, বিমানবন্দর এবং নৌঘাঁটি নির্মাণ বা ইজারা নিচ্ছে। ম্যাপের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই বাণিজ্যিক ও সামরিক কেন্দ্রগুলো একটার পর একটা এমনভাবে সাজানো যে, তা দেখতে একটি বিশাল ‘মুক্তার মালার’ মতো লাগে। আর এই মালার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে আটকে পড়েছে ভারত মহাসাগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দেশ, ভারত! ভারত মহাসাগরে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সুগম করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার লক্ষ্যেই চীন এই ‘পার্ল’ বা নৌঘাঁটিগুলো নীরবে তৈরি করছে।
২. এই ‘মালার’ প্রধান মুক্তাগুলো কোথায়? (Key Pearls)
চীন কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে এশিয়ান এবং আফ্রিকান দেশগুলোতে এই বন্দরগুলো তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ‘মুক্তা’ বা বন্দর হলো:
- গোয়াদর বন্দর (পাকিস্তান): এটি চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট। ‘চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ (CPEC)-এর অধীনে আরব সাগরের তীরে এই আধুনিক গভীর সমুদ্রবন্দরটি তৈরি করেছে চীন। এর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহন রুট ‘হরমুজ প্রণালী’-এর খুব কাছাকাছি এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলের ঠিক নাকের ডগায় অবস্থিত।
- হাম্বানটোটা বন্দর (শ্রীলঙ্কা): এটি ভারতের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, আন্তর্জাতিক পূর্ব-পশ্চিম শিপিং রুটের ঠিক উপরে অবস্থিত। চীন এখানে বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে বন্দর তৈরি করেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সেই ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ঋণের ফাঁদে (Debt-Trap Diplomacy) ফেলে চীন ২০১৭ সালে এই বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। এটি ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
- চিয়াউকপিউ বন্দর (মিয়ানমার): বঙ্গোপসাগরের তীরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এই বিশাল গভীর সমুদ্রবন্দরটি তৈরি করছে চীন। এখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যা মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতা কমিয়েছে। এটি ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং পূর্ব উপকূলের জন্য সরাসরি একটি বড় হুমকি।
- জিবুতি নৌঘাঁটি (হর্ন অফ আফ্রিকা): এটি চীনের দেশের বাইরের প্রথম এবং একমাত্র আনুষ্ঠানিক বিদেশি সামরিক ঘাঁটি (Military Base)। ২০১৭ সালে স্থাপিত এই ঘাঁটির মাধ্যমে চীন লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল এবং গালফ অফ এডেন-এর প্রবেশমুখে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
- চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর (বাংলাদেশ): চীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এই বন্দরগুলোকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করার নীতিতে অটল রয়েছে। তাই ভারত কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও, বঙ্গোপসাগরে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি নিয়ে তাদের সতর্ক দৃষ্টি সবসময় রয়েছে।
৩. চীন কেন এই কৌশল হাতে নিয়েছে?
চীনের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ, সময় এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যয় করে এই বন্দরগুলো তৈরির পেছনে প্রধান দুটি কারণ রয়েছে:
- মালাক্কা প্রণালী সংকট (Malacca Dilemma): চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও সর্বপ্রথম এই সঙ্কটের কথা তুলে ধরেন। চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং তা ‘মালাক্কা প্রণালী’ নামক একটি অত্যন্ত সরু সমুদ্রপথ দিয়ে চীনে ঢোকে। যুদ্ধ লাগলে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত যেকোনো সময় এই প্রণালী বন্ধ করে চীনের তেলের সাপ্লাই লাইন পুরোপুরি কেটে দিতে পারে। এই গভীর ভয় থেকে বাঁচতেই চীন ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’-এর মাধ্যমে বিকল্প পথ (যেমন পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে সরাসরি চীনের শিনজিয়াং পর্যন্ত সড়ক) তৈরি করছে।
- বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও সামরিক আধিপত্য বিস্তার: চীনের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) সুরক্ষিত করতে ভারত মহাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জানান দেওয়া এবং এশিয়ার অঘোষিত কৌশলগত পরাশক্তি হওয়ার লক্ষ্যেই চীনের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ।
৪. ভারতের জন্য এটি কেন ‘দুঃস্বপ্ন’?
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ হলো ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার একটি নিখুঁত সামরিক ছক বা ‘Containment Strategy’।
চীনের তৈরি করা এই প্রতিটি বন্দর মূলত বাণিজ্যিক (Commercial Port)। কিন্তু ভারতের সবচেয়ে বড় ভয় হলো দ্বৈত-ব্যবহার বা ‘Dual-Use’ সুবিধা। অর্থাৎ, যুদ্ধ বা চরম ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের সময় চীন মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে এগুলোকে রিফুয়েলিং মেরামত এবং সরাসরি সামরিক নৌঘাঁটিতে (Naval Base) রূপান্তর করতে পারবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, এবং মিয়ানমারে চীনের ডুবোজাহাজ (Submarine), গুপ্তচর জাহাজ এবং যুদ্ধ জাহাজের আনাগোনা ভারতকে তিন দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। এক কথায়, ঐতিহাসিকভাবে ভারত মহাসাগরে ভারতের যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, চীন সেই একচেটিয়া রাজত্বে ভাগ বসিয়েছে।
৫. ভারতের পাল্টা পদক্ষেপ কী?
চীনকে প্রতিহত করতে ভারতও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ভারত মূলত দুটি আক্রমণাত্মক উপায়ে চীনের এই কৌশল মোকাবেলা করছে:
- নেকলেস অফ ডায়মন্ডস (Necklace of Diamonds): এটি চীনের ‘মুক্তার মালার’ পাল্টা হিসেবে ভারতের তৈরি করা কৌশল। ভারতও এখন চীনের স্ট্রিং কাটতে কৌশলগত সমুদ্রবন্দর ও নৌঘাঁটি তৈরি করছে। যেমন: ইরানের চাবাহার বন্দর (গোয়াদরের উল্টো দিকে), ওমানের দুকুম বন্দর, ইন্দোনেশিয়ার সাবাহ বন্দর এবং সেশেলস-এর অ্যাজাম্পশন দ্বীপে ভারতের সামরিক চুক্তি রয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতও চীনের মুক্তার মালাকে চারপাশ থেকে ঘেরাও করছে।
- কোয়াড (Quad) জোট গঠন: ভারত মহাসাগরে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য রুখতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে মিলে ‘কোয়াড’ সামরিক ও কৌশলগত জোটে যোগ দিয়েছে। 👉 কোয়াড (Quad) কী এবং কেন এটি গঠিত হয়েছিল? বিস্তারিত জানতে আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ুন।
উপসংহার: ভারত মহাসাগরের নীল জলে চীন ও ভারতের এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল আগামী শতাব্দীর সবচেয়ে বড় স্নায়ুযুদ্ধ। চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ কৌশল সফল হলে তা কেবল ভারতের জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্ব-বাণিজ্যের সমীকরণ পাল্টে দেবে। আর এই শক্তির লড়াইয়ে বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মতো আশেপাশের দেশগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেদের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।