AskBangla
US Military helicopters flying
আন্তর্জাতিক

সেন্টকম (CENTCOM) কী? মার্কিন সামরিক বাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার

Ifty Islam

MD. Ifthe Kharul Islam (Ifty)

Exploring new things.

আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনামে আমরা প্রায়ই শুনি— “মার্কিন সেন্টকম (CENTCOM) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে” বা “পেন্টাগনের নির্দেশে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে রণতরি পাঠানো হয়েছে”। এসব খবর শুনে সাধারণ পাঠকদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, সেন্টকম কী? বা মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই জটিল কমান্ড স্ট্রাকচার (Command Structure) আসলে কীভাবে কাজ করে?

কল্পনা করুন, পুরো পৃথিবীটা একটি বিশাল দাবার বোর্ড। আর পেন্টাগন (মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর) সেই বোর্ডের প্রতিটি প্রান্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। সারাবিশ্বে নিজেদের সামরিক আধিপত্য, স্বার্থ ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরো পৃথিবীকে কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাগ করে তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল পরিচালনা ব্যবস্থাকে বলা হয় ইউনিফায়েড কমব্যাট্যান্ট কমান্ড (Unified Combatant Command বা UCC)

১৯৮৬ সালের সামরিক সংস্কার আইনের (Goldwater-Nichols Act) মাধ্যমে এই কাঠামোর আধুনিক রূপ দেওয়া হয়। বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মোট ১১টি ইউনিফায়েড কমব্যাট্যান্ট কমান্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হলো ভৌগোলিক (Geographic—নির্দিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্বে) এবং ৪টি হলো বিশেষ কার্যভিত্তিক (Functional) কমান্ড।

চলুন জেনে নিই এই ১১টি কমান্ডের সদরদপ্তর, ইতিহাস এবং চমকপ্রদ সব কাজের বিস্তারিত।


ভৌগোলিক কমান্ড (Geographic Combatant Commands)

পুরো পৃথিবীকে ৭টি অঞ্চলে (Area of Responsibility বা AOR) ভাগ করে এই কমান্ডগুলো গঠন করা হয়েছে।

Unified Combatant Commands Map

১. ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (USCENTCOM বা সেন্টকম)

সদরদপ্তর: ম্যাকডিল এয়ার ফোর্ন বেস (ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র)
যুদ্ধ ও সংঘাতের খবরে সেন্টকমের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। ১৯৮৩ সালে গঠিত এই কমান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান ফ্লোরিডায় হলেও, এদের মূল দায়িত্বের অঞ্চল হলো মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশ (পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ)। বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও খনিজ তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলে এর অবস্থান।

২. ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড (USINDOPACOM)

সদরদপ্তর: ক্যাম্প এইচ. এম. স্মিথ (হাওয়াই, যুক্তরাষ্ট্র)
ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কমান্ড। এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৫২ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশ থেকে শুরু করে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল—সবটাই এদের কমান্ডের অধীনে।

৩. ইউএস ইউরোপিয়ান কমান্ড (USEUCOM)

সদরদপ্তর: স্টুটগার্ট (জার্মানি)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য মূলত এই কমান্ডকে শক্তিশালী করা হয়। পুরো ইউরোপ মহাদেশ, রাশিয়া, এবং গ্রিনল্যান্ড এই ইউরোপিয়ান কমান্ডের আওতাভুক্ত।

৪. ইউএস আফ্রিকা কমান্ড (USAFRICOM)

সদরদপ্তর: স্টুটগার্ট (জার্মানি)
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এটি অন্যতম নবীন কমান্ড। এর আওতাভুক্ত অঞ্চল হলো আফ্রিকা মহাদেশ (মিশর বাদে, কারণ মিশর সেন্টকমের অধীনে)। মজার ব্যাপার হলো, আফ্রিকার কোনো দেশ এই কমান্ডের সদরদপ্তর তাদের মাটিতে স্থাপন করতে রাজি না হওয়ায়, এটি আপাতত জার্মানি থেকেই পরিচালিত হয়।

৫. ইউএস নর্দার্ন কমান্ড (USNORTHCOM)

সদরদপ্তর: পিটারসন স্পেস ফোর্স বেস (কলোরাডো, যুক্তরাষ্ট্র)
২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন (9/11) সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিনিরা বুঝতে পারে যে খোদ তাদের নিজের মাটিই সবার আগে রক্ষা করতে হবে। এরপর ২০০২ সালে গঠিত হয় নর্দার্ন কমান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অবস্থান অর্থাৎ উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো) রক্ষার মূল দায়িত্ব এদের। এটি বিখ্যাত ‘নোরাড’ (NORAD)-এর সাথে মিলে আমেরিকার আকাশসীমায় ২৪ ঘণ্টা নজর রাখে।

৬. ইউএস সাদার্ন কমান্ড (USSOUTHCOM)

সদরদপ্তর: মিয়ামি (ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র)
যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক নিচেই অবস্থিত ল্যাটিন আমেরিকা (দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা) এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এই কমান্ডের অন্তর্ভুক্ত।

৭. ইউএস স্পেস কমান্ড (USSPACECOM)

সদরদপ্তর: পিটারসন স্পেস ফোর্স বেস (কলোরাডো, যুক্তরাষ্ট্র)
ভূমি, জল আর বায়ুর পর যুদ্ধ এখন পৌঁছেছে মহাকাশে। স্যাটেলাইট ধ্বংসকারী মিসাইল বা লেজার অস্ত্রের হুমকি ঠেকাতে ২০১৯ সালে এই কমান্ডকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরে, ১০০ কিলোমিটার উচ্চতার পর অর্থাৎ মহাকাশে (Outer Space) যেকোনো ধরনের সামরিক হুমকি মোকাবেলা করা এদের কাজ।


কার্যভিত্তিক কমান্ড (Functional Combatant Commands)

এই ৪টি কমান্ডের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নেই। বরং এরা সারাবিশ্বেই নিজেদের বিশেষ কার্যসিদ্ধির জন্য নিযুক্ত থাকে।

৮. ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (USSOCOM)

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে চৌকস এবং ছায়াসঙ্গী ইউনিটগুলো—যেমন নৌবাহিনীর ‘নেভি সিল’ (Navy SEALs), সেনাবাহিনীর ‘ডেল্টা ফোর্স’ বা ‘গ্রিন বেরেট’—এই কমান্ডের আওতাধীন। সারাবিশ্বে অতি-গোপনীয় কোনো গুপ্তহত্যা, জিম্মি উদ্ধার বা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকে এই স্পেশাল ফোর্স। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেন নিকেষ অভিযানটি ছিল সোকম (SOCOM)-এর একটি যুগান্তকারী অপারেশন।

৯. ইউএস সাইবার কমান্ড (USCYBERCOM)

আধুনিক ডিজিটাল যুগে যুদ্ধ শুধু ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, দেশের পাওয়ার গ্রিড বা ব্যাংকিং সেক্টর হ্যাক করেও একটি দেশকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। তাই সাইবার স্পেসে মার্কিন সামরিক নেটওয়ার্ক রক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষের ওপর বিধ্বংসী সাইবার হামলা চালানোর দায়িত্ব ইউএস সাইবার কমান্ডের। এর সদরদপ্তর ফোর্ট মিডে অবস্থিত, এবং এর প্রধান সবসময় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা এনএসএ (NSA)-এর পরিচালক হয়ে থাকেন।

১০. ইউএস স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড (USSTRATCOM)

এই কমান্ডের হাতে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর শক্তি— পারমাণবিক অস্ত্র (Nuclear Arsenal)। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন এবং গ্লোবাল স্ট্রাইক (বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পারমাণবিক বোমা বা হামলা করার ক্ষমতা) পরিচালনা করার সর্বোচ্চ চাবিকাঠি স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কাছে।

১১. ইউএস ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ড (USTRANSCOM)

আর্মি বা নেভির মতো এদের সরাসরি কোনো যুদ্ধাস্ত্র নেই, কিন্তু এদের ছাড়া মার্কিন বাহিনী অচল! বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার সৈন্য, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক বা সামরিক রসদ পৌঁছে দেওয়ার জাদুকরী দায়িত্ব হলো ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ডের। এদের বিশাল লজিস্টিক সাপোর্টের কারণেই হাজার মাইল দূরের যুদ্ধেও আমেরিকান সেনারা কোনো অভাব বোধ করে না।

পরিশেষে:
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই বিস্তারিত এবং সুশৃঙ্খল কমান্ড স্ট্রাকচারই (Command Structure) মূলত তাদের বিশ্বের আধুনিক সুপারপাওয়ার বা পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। এই ১১টি ইউনিফায়েড কমব্যাট্যান্ট কমান্ডের মাধ্যমে পেন্টাগন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভুখণ্ডই নয়, বরং পুরো বিশ্ব, সাইবার জগত এবং মহাকাশকেও নিজেদের কঠোর সামরিক রাডারের আওতায় রেখেছে।