শীতকাল হোক বা গরমকাল, অনেকেরই খুব পছন্দের একটি খাবার হলো খেজুর। মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি শুধু খেতেই মজাদার নয়, পুষ্টিগুণেও একদম ভরপুর। কিন্তু একটা প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই ঘোরে— “একদিনে আসলে কতগুলো খেজুর খাওয়া উচিত?” বেশি খেলে কি কোনো ক্ষতি হবে? বা বাচ্চা ও বয়স্কদের জন্য কি একই হিসাব?
চলুন, আজকে আমরা এই বিষয়ে একদম সহজ ভাষায় সবকিছু জেনে নিই!
খেজুর কেন এত উপকারী?
খেজুরে আছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন বি-৬। এর প্রাকৃতিক শর্করা (ফ্রুক্টোজ) শরীরকে খুব দ্রুত এনার্জি দেয়। তাই রোজার সময় ইফতারে বা সকালে খালি পেটে খেজুর খাওয়া খুব ভালো।
দিনে ঠিক কয়টি খেজুর খাওয়া উচিত?
সাধারণত, একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের জন্য দিনে ৩ থেকে ৬টি খেজুর খাওয়াই যথেষ্ট। তবে এই পরিমাণটা নির্ভর করে আপনার বয়স, ওজন এবং শারীরিক অবস্থার ওপর। আপনি যদি নিয়মিত জিম করেন বা ভারী কাজ করেন, তাহলে আরেকটু বেশি খেতে পারেন। কিন্তু এমনি সাধারণ রুটিনের জন্য ৩-৬টি খেজুরই পারফেক্ট!
বয়স অনুযায়ী খেজুর খাওয়ার পরিমাণ (Age-wise Restriction)
কার জন্য কয়টি খেজুর সঠিক, তার একটা সহজ গাইডলাইন নিচে দেওয়া হলো:
১. ছোট বাচ্চাদের জন্য (১-৫ বছর)
বাচ্চাদের হজমশক্তি বড়দের মতো শক্তিশালী থাকে না। তাই এই বয়সের বাচ্চাদের দিনে ১ থেকে ২টি খেজুর দেওয়াই ভালো। ছোট বাচ্চাদের দেওয়ার সময় খেজুরের বিচি ফেলে, প্রয়োজনে একটু নরম করে বা ব্লেন্ড করে দুধের সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন।
২. বড় বাচ্চাদের জন্য (৬-১২ বছর)
এই বয়সে বাচ্চাদের প্রচুর এনার্জি দরকার হয়। তারা চাইলে দিনে ২ থেকে ৩টি খেজুর অনায়াসে খেতে পারে। এটি তাদের ব্রেনের ফোকাস বাড়াতে আর শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।
৩. টিনএজার ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য (১৩-৫০ বছর)
আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং আপনার ডায়াবেটিসের কোনো সমস্যা না থাকে, তবে আপনি নিশ্চিন্তে দিনে ৩ থেকে ৬টি খেজুর খেতে পারেন। বিশেষ করে যারা সারাদিন কাজের মধ্যে থাকেন, তাদের জন্য সকালে ৩টি খেজুর ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
৪. বয়স্কদের জন্য (৫০ বছরের ওপরে)
বয়স্কদের ক্ষেত্রে হজমশক্তি একটু কমে যায়। তাই তাদের দিনে ২ থেকে ৩টি খেজুর খাওয়া নিরাপদ। যদি কারও ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে পরিমাণ ঠিক করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা অনেক সময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে ১টি ছোট সাইজের খেজুর খেতে পারেন।
বিজ্ঞান কী বলে? (Scientific Research)
গবেষণা অনুযায়ী, খেজুর মিষ্টি হলেও এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা GI (Glycemic Index) বেশ কম (গড়ে ৪২)। এর মানে হলো, এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত বাড়ে না।
পাবমেড (PubMed)-এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে:
- ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে: একটি ১৬ সপ্তাহের গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা প্রতিদিন ৩টি করে খেজুর খেলে তাদের শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমে যায়। সেই সাথে তাদের সুগার লেভেলে (HbA1c) কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না।
- মিষ্টি শোষণের হার কমানো: স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, খেজুরের সাথে বাদাম, কাঠবাদাম বা দই খেলে এতে থাকা প্রোটিন ও ফ্যাট শরীরে মিষ্টি শোষণের হার আরও ধীর করে দেয়। ফলে রক্তে সুগার বাড়ে না।
সুতরাং, বিজ্ঞানের মতে নিয়মিত ১ থেকে ৩টি খেজুর খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও বেশ নিরাপদ, তবে অবশ্যই মাঝারি পরিমাণে।
বেশি খেজুর খেলে কী হতে পারে?
খেজুর অনেক স্বাস্থ্যকর হলেও অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। খুব বেশি খেজুর খেলে বেশ কিছু সমস্যা হতে পারে, যেমন:
- ওজন বৃদ্ধি: খেজুরে অনেক ক্যালরি থাকে। তাই বেশি খেলে ওজন বাড়ে।
- ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়া: অতিরিক্ত মিষ্টি হওয়ায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে।
- হজমের সমস্যা: খেজুরে প্রচুর ফাইবার পেটে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা বদহজমের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কখন খেজুর খাওয়া সবচেয়ে ভালো?
- সকালে খালি পেটে: সারাদিনের এনার্জির জন্য।
- ব্যায়ামের আগে বা পরে: শরীরকে দ্রুত চার্জ আপ করতে।
- মিষ্টি খাওয়ার ক্রেভিং হলে: চিনি জাতীয় ক্ষতিকর মিষ্টির বদলে খেজুর একটি দারুণ হেলদি অপশন।
শেষ কথা
মাঝারি পরিমাণে খেলে খেজুর আমাদের শরীরের জন্য সত্যিই একটা সুপারফুড। তাই আপনার বয়স এবং শরীরের অবস্থা বুঝে পরিমাণমতো খেজুর খান আর সুস্থ থাকুন!