সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর বিছানায় শুলে যদি ঘুম না আসে, তবে এর চেয়ে বিরক্তিকর আর কিছুই হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন। এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটানো অনেকেই ঘুম আনার নানা কৌশল খোঁজেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে টিকটকে ভাইরাল হওয়া একটি উপায় হলো ‘মিলিটারি স্লিপ মেথড’ বা ২ মিনিটে ঘুমানোর জাদুকরী কৌশল।
ভিডিওগুলোতে দাবি করা হয়, এই কৌশল অনুসরণ করলে মাত্র দুই মিনিটেই আপনার চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে আসবে। কিন্তু বিজ্ঞানের মতে, এই দাবির সত্যতা কতটুকু? চলুন জেনে নিই।
মিলিটারি স্লিপ মেথড (Military Sleep Method) কী?
এই বিশেষ কৌশলের প্রবর্তক আমেরিকান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড কোচ লয়েড ‘বাড’ উইন্টার। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘রিল্যাক্স অ্যান্ড উইন’ বইতে তিনি প্রথম এই পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউএস নেভির প্রিফ্লাইট স্কুলের বিমানচালকরা যাতে তীব্র মানসিক চাপের মধ্যেও ভালো ঘুমাতে পারেন এবং নিজেদের সেরাটা দিতে পারেন, তার জন্যই মূলত এই কৌশলটি আবিষ্কার করা হয়েছিল।
কিভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?
মিলিটারি স্লিপ মেথড অনুসরণ করতে চাইলে এই ৬টি ধাপ অবলম্বন করতে হবে:
১. মুখমণ্ডল শিথিল করুন: কপাল, মাথার ত্বক, চোয়াল ও মুখ পর্যায়ক্রমে পুরোপুরি শিথিল বা রিল্যাক্স করুন এবং ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন। ২. কাঁধ ও বুক: কাঁধকে নিচের দিকে নামান এবং বড় করে শ্বাস নিয়ে ছাড়ুন। বুকের পেশিগুলোকে ধীরে ধীরে শিথিল করুন। ৩. হাত: যেখানে শুয়েছেন সেখানে আপনার পুরো হাতটি ছেড়ে দিন। বাইসেপ বা বাহু, কনুইয়ের নিচের অংশ এবং হাতের তালু ক্রমান্বয়ে শিথিল করুন। অন্য হাতটিও একইভাবে শিথিল করুন। ৪. পা: এবার পা শিথিল করুন— উরু থেকে শুরু করে পায়ের কাফ (পেছনের নিম্নাংশ), গোড়ালি এবং সবার শেষে পায়ের পাতা। এরপর অন্য পা-ও একইভাবে রিলাক্স করুন। ৫. মন শান্ত করুন: এবার মনের সব দৈনন্দিন চিন্তা দূরে সরিয়ে দিয়ে আরামদায়ক কিছু কল্পনা করুন। উদাহরণস্বরূপ, শান্ত কোনো হ্রদের পাশে বসে আছেন বা বসন্তের কোনো সুন্দর দিনের কথা ভাবতে পারেন। ৬. বারবার বলা: যদি মন শান্ত করা কঠিন মনে হয়, তবে মনে মনে কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড টানা “চিন্তা করো না” বা “ডোন্ট থিংক” বাক্যটি বারবার জপতে থাকুন।
উইন্টার দাবি করেছিলেন, মাত্র ছয় সপ্তাহের টানা অনুশীলনে বিমানচালকরা দিনে বা রাতে, যে কোনো পরিবেশে দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমাতে শিখে যেতেন।
আসলেই কি ২ মিনিটে ঘুম আসে?
বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এই বিষয়ে ভিন্ন কথা বলছেন। মিলিটারি নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন ব্র্যাগার বলেন, এই পদ্ধতিতে আপনি ঘুমাতে পারবেন ঠিকই, তবে মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার আশা করাটা অবাস্তব এবং বিপজ্জনক।
গড়পড়তা মানুষের স্বাভাবিকভাবে ঘুম আসতে সাধারণত ৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তাই, জোর করে ২ মিনিটে ঘুমানোর চেষ্টা করলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। আপনি শুধু হতাশই হবেন এবং বিরক্তির কারণে আপনার ঘুম ঘুম ভাব আরও কমে যেতে পারে।
৮ ঘণ্টা ঘুমের মিথ
অনেকেই মনে করেন, সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের প্রতিদিন ঠিক ৮ ঘণ্টা ঘুমানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা একে একটি “ধ্বংসাত্মক মিথ” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটালের ঘুমবিষয়ক ক্লিনিকের প্রধান চিকিৎসক ডা. হিউ সেলসিকের মতে, ৮ ঘণ্টা ঘুমের চিন্তা মানুষের মনে অহেতুক একটা চাপ সৃষ্টি করে। তিনি জুতোর সাইজের সাথে এর তুলনা করে বলেন, সবার যেমন এক মাপের জুতো লাগে না, তেমনি সবার ঘুমের চাহিদাও এক নয়। কারো হয়তো ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমের প্রয়োজন, আবার কারো তার চেয়ে কম।
আপনি দিনভর নিজেকে চনমনে এবং উজ্জীবিত মনে করছেন কিনা, সেটাই হলো আপনার সঠিক ঘুমের মানদণ্ড।
দ্রুত ঘুমানোর কার্যকরী ৩টি টিপস
মিলিটারি স্লিপ মেথডের বাইরেও বিশেষজ্ঞরা দ্রুত ও গভীর ঘুমের জন্য কিছু পরামর্শ দেন:
- নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। এতে আপনার বায়োলজিক্যাল ক্লক বা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি সেট হয়ে যাবে এবং প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে আপনার ঘুম আসতে শুরু করবে।
- দিনের বেলা না ঘুমানো: দিনে ছোট ঘুম বা ন্যাপ নেয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করুন। এতে রাতে দ্রুত ঘুম আসতে সুবিধা হয়।
- ক্লান্ত হলেই ঘুমাতে যান: যদি শরীর ঘুমের জন্য প্রস্তুত না থাকে, তাহলে শুধু শুধু বিছানায় শুয়ে থাকবেন না। বই পড়ুন, বা শান্ত কোনো কাজ করুন। যখন দেখবেন আপনার চোখ ভারী হয়ে আসছে বা ঘুমে মাথা নুয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই ঘুমানোর জন্য বিছানায় যান।
শেষ কথা
সেনাবাহিনীর ঘুমানোর কৌশল থেকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা নিতে পারে, তা হলো শৃঙ্খলা। প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাওয়া, ডিজিটাল ডিভাইস দূরে রাখা এবং ঘুমের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই হলো দ্রুত ও গভীর ঘুমের আসল মন্ত্র।